প্রয়াসের মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন : দারিদ্র্যকে জয় গোদাগাড়ীর নূরমহল বেগমের

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম বান্ধাপুকুর। এই গ্রামেরই বাসিন্দা নূরমহল বেগম। দারিদ্র্যের কষাঘাতে ছিলেন জর্জরিত। পাঁচ সদস্যের সংসারে অভাব-অনটন সর্বদাই লেগে থাকত। স্বামী অন্যের জমিতে ছাগল পালন ও ঘাস চাষ করে যা পেতেন তা দিয়ে সংসারের মৌলিক খরচ জোগানো ছিল তেল আনতে নুন ফুরোনোর মতো।
সেই নূরমহল বেগম আজ স্বাবলম্বী। অভাবের তাড়না তাকে দমাতে পারেনি। মনে জোর ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর। সেই ইচ্ছে থেকে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন তিনি। এখন আরো বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। আর তাকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি।
অভাবকে দূরে ঠেলে ফেলতেই ২০১৬ সালে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির ইউনিট-১২ চরঅনুপনগরের বনলতা মহিলা সমিতির সদস্য হিসেবে যুক্ত হন নূরমহল। আগে সনাতন পদ্ধতিতে ছাগল পালন করলেও প্রয়াসের লিফট প্রকল্পের মাচা পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে উদ্বুদ্ধ হন। প্রশিক্ষণও নেন মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন বিষয়ে। এরপর ২০১৭ সালে ওই প্রকল্প থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ৪টি মা ছাগল দিয়ে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল লালন-পালন শুরু করেন। সেই যে শুরু, আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি নূরমহলকে। এখন তিনি ওই সমিতির একজন সফল সদস্য। অন্য সদস্যরাও তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।
নিজের ঘুরে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে নূরমহল বলেন, সংসারে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। স্বামীর যা আয় হতো তাতে তিন ছেলেমেয়ের তিন বেলা আহার জোগানোই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ত। এ অবস্থায় যোগ দিই প্রয়াসের বনলতা মহিলা সমিতিতে। তিনি বলেন, সেখানে গিয়ে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল লালন-পালন সম্পর্কে জানতে পেরে আমিও প্রশিক্ষণ নিই এবং একটি মা ছাগল বিনামূল্যে পাই। এরপর ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে আরো ৪টি মা ছাগল কিনি এবং তাদের পরামর্শমতো মাচা পদ্ধতিতে পালন শুরু করি। এ বিষয়ে প্রয়াসের লোকজন সবসময় খোঁজখবর রাখতেন।
নূরমহল জানান, পাঁচটি ছাগল দিয়ে শুরু করে বর্তমানে তিনি ১৯টির মালিক। বছরে ছাগল বিক্রি করে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। ছাগলের ঘাসের জন্য তিনি এক বিঘা জমি লিজও নিয়েছেন। এখন স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ভালোই আছেন বলে জানান তিনি।
কথা হয় প্রয়াসের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাজিন বিন রেজাউলের সঙ্গে। তিনি বলেন, নূরমহল ছাগলগুলো সঠিকভাবে লালন-পালন করার জন্য আমাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিয়েছেন। তিনি কঠোর পরিশ্রম করতেন। নিয়মিত ছাগল চরাতেন, দানাদার খাবার দিতেন এবং সময়মতো টিকা ও ওষুধ খাওয়াতেন। এই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরো বলেন, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহায়তায় ও প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির বাস্তবায়নে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে লিফট প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে প্রয়াসের ইউনিট-১ গোবরাতলা, ইউনিট-৬ সদর, ইউনিট-১২ চর অনুপনগর, ইউনিট-১৫ নাচোল, ইউনিট-২৩ নতুনহাট ও ইউনিট-৩৭ দ্বিগ্রামে এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
ডা. রাজিন বিন রেজাউল বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জন সদস্যকে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। নূরমহলও নিজে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রশিক্ষণ নেন।
এই বিষয়ে প্রয়াসের লিফট কর্মসূচির ফোকাল পারসন ডা. মো. শাহরিয়ার কামাল বলেন, দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণে যেসব এনজিও বা বেসরকারি সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে তাদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি অন্যতম। জেলার দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী হতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে প্রয়াস। এর মূল কার্যক্রম ক্ষুদ্রঋণের সাথে প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন, মৎস্য চাষ, কৃষি, ছাগল, ভেড়া, টার্কি, কুচিয়া, জমিবন্ধক প্রকল্পও রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর আওতায় জেলার প্রায় ১২ হাজার দরিদ্র নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে লিফট ছাগল পালন প্রকল্পের আওতায় ২য় পর্যায়ে মোট ২৭২ জন নারীকে ছাগল পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও একটি করে বাড়ন্ত ছাগী প্রদান করা হয়। তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষণে অংশ নেন গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের বান্ধাপুকুর গ্রামের নূরমহল বেগম। তিনি এখন সফল ও স্বাবলম্বী একজন সদস্য। তাকে দেখে অন্য সদস্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। অল্প পুঁজি ও শ্রমে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন করে অনেকেই স্বাবলস্বী হচ্ছেন বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।