প্রয়াসের সহায়তায় চরে বরই চাষে হাসি ফুটল তাসেমের

মানুষ স্বপ্ন বিলাসী। সকলেই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসলেও অনেক সময় তা বাস্তবে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে ঘুমিয়ে থেকে দেখা স্বপ্ন আর জেগে স্বপ্ন দেখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আর জেগে স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই আজ হাসি ফুটেছে চরাঞ্চলের চাষি তাসেম আলীর মুখে। যার মুখে হাসি ফোটাতে সবরকমের সহায়তা করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। উল্লেখ্য, তাসেম আলীর স্ত্রী মোসা. নুরজাহান বেগম প্রয়াসের সদস্য।
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চর পাঁকা ইউনিয়নের শিশাতলা গ্রামে বাড়ি তাসেম আলীর। তারা এমনই এক অঞ্চলে বসবাস করেন, যেখানে নেই কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা। সেচের সুব্যবস্থাও নেই। প্রায় প্রতি বছর বন্যায় ডুবে যাওয়া অঞ্চলটি কৃষিক্ষেত্রে অনেকটাই অনুপযোগী হয়ে থাকত। তাছাড়া নদী ভাঙনের কারণে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চর জেগে ওঠে। ফলে অধিকাংশ জায়গা পতিত পড়ে থাকত। এখন সে দিন বদলেছে।
এই পতিত জমির মধ্যে নুরজাহান বেগমের বিঘা দশেক জমি ছিল। যা প্রায় বছরই চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে থাকত। ফসল ফলানো ছিল কষ্টসাধ্য তাই চাষে অনাগ্রহী ছিলেন নুরজাহানের স্বামী তাসেম। তারপরও সংসার পরিচালনার জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবেলা করে জীবন অতিবাহিত করতে হতো তাদের।
নুরজাহান বেগম যে অঞ্চলে বসবাস করেন, সে অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অসহায় মানুষদের মধ্যে ঋণ বিতরণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। প্রয়াসের লিফট প্রকল্প, যা চর ল্যান্ড লিজ কর্মসূচি নামে পরিচিত। এর আওতায় প্রাণী, স্বাস্থ্য, কৃষি ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রয়াসের সূত্র ধরে নুরজাহান বেগম ও তার স্বামী তাসেমের যোগাযোগ হয় এ প্রকল্পের কারিগরি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। বিস্তারিত সব শুনে তিনি তাসেম আলীকে তার জমিতে উচ্চ ফলনশীল জাত ‘বলসুন্দরী’ বরই চাষের পরামর্শ এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনাও দেন। এটি ২০১৮ সালের শেষের দিকের কথা।
এরপর তাসেম আলী কারিগরি কর্মকর্তার পরামর্শে সাড়া দিয়ে গত বছর শুরুর দিকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে তার ৫ বিঘা জমিতে বরই চাষ শুরু করেন। এজন্য তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম প্রয়াসের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। আর লিফট প্রকল্প থেকে বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা পেতে থাকেন। কষ্টের ফল পেতে শুরু করেছেন নুরজাহান বেগম ও তার স্বামী তাসেম আলী। প্রায় বছরখানেকের মাথায় বরই বিক্রি শুরু করেন তারা। বাগানের ৮০০ গাছ থেকে ৪০০ মণ বরই বিক্রি করেছেন তারা। বিক্রি থেকে যে অর্থ পেয়েছেন তা থেকে চাষাবাদ ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা লাভ করেছেন তারা। অকপটে এ কথা জানান তারা। বললেন, বড় স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। আরো ১৫ বিঘা জমিতে শুরু করেছেন বরই চাষ। উদ্দেশ্যে, ভালো কিছু করার প্রত্যয়। নিজের চেষ্টা দিয়ে শুরু করে তাসেম আলী এখন তার বরই বাগানে কিছু মানুষকে কাজে লাগাতেও পেরেছেন।
তাসেম আলী বলেন, এখন আমি প্রতিদিন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি। কোনো দিন ভাবতেও পারিনি চরাঞ্চলে এত বিশাল বাগান করতে পারব। তিনি প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেন, এই প্রকল্পের মতো প্রয়াস যদি আরো অন্য কোনো সুযোগ মানুষকে করে দিত তাহলে আমার মতো আরো অনেকেই আশার আলো দেখতে পারবে। সহায়তা পেলে শুধু নিজেরই নয়, এর মধ্য দিয়ে এলাকার ও নিজেদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারবে।
এ বিষয়ে প্রয়াসের লিফট কর্মসূচির ফোকাল পারসন ডা. মো. শাহরিয়ার কামাল বলেন, চরাঞ্চলের মানুষদের ভাগ্য ফেরাতে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় কাজ করে যাচ্ছে প্রয়াস। আমাদের চর ল্যান্ড লিজ প্রকল্পের আওতায় চরাঞ্চলে অব্যবহৃত জমিকে চাষের আওতায় নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন ধরনের উচ্চমূল্যের ফসল চাষে উদ্ধুদ্ধ করে আসছি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রয়াসের সদস্য নুরজাহান বেগমের স্বামীকে চরাঞ্চলে বরই চাষের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। তিনি বলেন, প্রথমে আমরা উচ্চ ফলনশীল জাত চাষাবাদের জন্য সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করি। এরপর জমি অনুযায়ী কি চাষ করলে ভালো হবে সেটা বলি।
শাহরিয়ার কামাল আরো বলেন, চাষাবাদ ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ভেড়া ইত্যাদি পালনের জন্য টিকা প্রদান ও কৃমিনাশক ওষুধ বিতরণসহ কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, একজন সদস্যকে স্বাবলম্বী করতে ঋণ সহায়তা ছাড়াও আমরা প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা করে থাকি। এজন্য তাদের (সদস্যদের) কাছ থেকে কোনোরকম অর্থ নেয়া হয় না।
উল্লেখ্য, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহায়তায় প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি এই লিফট কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।